গমের উৎস যুক্তরাষ্ট্র, অর্থ পাবে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান

» টনপ্রতি ৩৩ ডলার বেশি মূল্য » পুষ্টির মান তুলনামূলক কম

বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে প্রথমবারের মতো গম আমদানি হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গত ২০ জুলাই ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে প্রথমবারের মতো গম আমদানি হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গত ২০ জুলাই ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে গমের চারটি চালান যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে রওনা হয়েছে বলে পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রথম চালানটি ২৪ বা ২৫ অক্টোবর নাগাদ বাংলাদেশে পৌঁছার কথা রয়েছে, যার অর্থ পরিশোধ হবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক গম সরবরাহের তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠান এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনালের সিঙ্গাপুরের ব্যাংক হিসাবে।

গম আমদানির এ চুক্তি ও লেনদেন নিয়ে স্থানীয় ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবসায়ী মহল থেকে কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের দাবি, যে পুষ্টিমানের গম আমদানি করা হচ্ছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বিবেচনায় তা তুলনামূলক বেশি। আর সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গম রফতানিকারক হিসেবে সুনাম রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান থাকার পরও সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের এক্ষেত্রে সম্পৃক্ত থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেও মনে করেন তারা। তাদের দাবি, এ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে লক্ষ্য, তার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

গত ২০ জুলাই গম আমদানির চুক্তির পর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টিমান ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। আগামী পাঁচ বছর প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে সাত লাখ টন উচ্চমানের গম আমদানির বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর এবং আমেরিকার পক্ষে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ কে. সোয়ার স্বাক্ষর করেন।

চুক্তি অনুযায়ী, গমের ক্রেতা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য অধিদপ্তর। বিক্রেতা সিঙ্গাপুরে অবস্থিত এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেড। চুক্তি হয়েছে এ দুই পক্ষের মধ্যে। বিক্রেতাকে মনোনীত করেছে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটস। চুক্তি অনুযায়ী বিক্রেতা ক্রেতার কাছে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত ২০২৫ বা সর্বশেষ মৌসুমের ২ লাখ ২০ হাজার টন মিলিং গম বিক্রি করবে।

চুক্তিতে থাকা পরিশোধের শর্ত অনুযায়ী, ক্রেতা একটি অপরিবর্তনযোগ্য এলসি বা ঋণপত্র খুলবে, যার ভিত্তিতে শিপিং নথি গ্রহণের পর ৯৫ শতাংশ মূল্য পরিশোধ করা হবে। বাকি ৫ শতাংশ অর্থ গুণগত মান ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরিশোধ হবে। পণ্যের গুণগত মানের মাপকাঠিতে বলা হয়েছে, গমে প্রোটিনের মাত্রা (ড্রাই ম্যাটার বেসিস) ন্যূনতম ১১ দশমিক ৫ শতাংশ থাকতে হবে। পুষ্টির মাত্রা এর নিচে হলে চালান প্রত্যাখ্যান করা হবে। চুক্তিতে গমের মূল্যবিষয়ক ধারায় বলা হয়, প্রতি টনে দাম ৩০২ দশমিক ৭৫ ডলার। এর মধ্যে পণ্যমূল্য, বীমা, পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত। বিক্রেতা তার দেশে সব ধরনের কর ও চার্জ বহন করবে। ক্রেতা বাংলাদেশে সব ধরনের কর ও চার্জ বহন করবে।

ঋণপত্র অনুযায়ী গম পাঠানো হবে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বন্দরের মাধ্যমে। গম গ্রহণ করা হবে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে। মোট চালানের ৬০ শতাংশ আসবে চট্টগ্রামে ও ৪০ শতাংশ পৌঁছবে মোংলায়। ঋণপত্রে পণ্যের উৎস দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখ রয়েছে।

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বছরে সাত লাখ টন গম আমদানির জন্য গত ২০ জুলাই এমওইউ স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গম আমদানির জন্য এমওইউ স্বাক্ষর হওয়ার দুদিন পর ২৩ জুলাই সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় দেশটি থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ৮১৭ কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার ৭৫০ টাকা। ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে টনপ্রতি ৩০২ দশমিক ৭৫ ডলারে গম কেনার অনুমোদন দেয়া হয়।

গত ৭ অক্টোবর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকার টু সরকার পদ্ধতিতে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ গম কেনার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটস কর্তৃক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে এ গম কিনতে ব্যয় হবে ৮২৫ কোটি ৩১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। প্রতি টন গমের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০৮ ডলার।

ব্যবসায়ীদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে গম কেনা হচ্ছে সেটির দাম তুলনামূলক বেশি পড়ছে। গত ২৫ জুন অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান মেসার্স সেরেল কর্পস ট্রেডিং এলএলসির কাছ থেকে ৫০ হাজার টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রতি টনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৭৫ ডলার। সে হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আনতে প্রতি টনে বাড়তি ৩৩ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে।

গত ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির বিষয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আনার জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর যুক্তি হচ্ছে আমরা একটু ডাইভার্সিফাই করতে চাচ্ছি। অনেক সময় রাশিয়ান ব্লক কিংবা ইউক্রেন ব্লকে একটা অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখন আমাদের আমদানি বাড়ানোর নেগোসিয়েশন চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের গমের মান ভালো।’

যুক্তরাষ্ট্রের গমের দাম তুলনামূলক বেশি কিনা জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা সে সময় বলেন, ‘দাম একটু বেশি হলেও আমরা অন্যদিক দিয়ে সুবিধা পাব। এ গমের (যুক্তরাষ্ট্র) প্রোটিনও কিছুটা বেশি। প্রোটিন খুব বেশি তা নয়, তবে একটু বেশি।’

বিশ্বব্যাংকের পিংকশিটের তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আমিষযুক্ত গমের দাম ছিল টনপ্রতি ২৬৮ দশমিক ৭ ডলার। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) উচ্চ আমিষযুক্ত গমের দাম কমে ২৫৮ ডলারে দাঁড়ায়। এর পরের দুই প্রান্তিকেও এ গমের দাম ছিল নিম্নমুখী। এর মধ্যে দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ২৪২ দশমিক ২ ডলার এবং তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আমিষযুক্ত গমের দাম দাঁড়িয়েছে ২৩৩ দশমিক ৩ ডলারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কম আমিষযুক্ত গমের গড় দাম ২০২৪ সালে ছিল টনপ্রতি ২৩০ দশমিক ৯ ডলার। চলতি বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে এ গমের দাম ধারাবাহিকভাবে কমে টনপ্রতি যথাক্রমে ২৩৩ দশমিক ৯, ২১৯ দশমিক ৪ ও ২০৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বৃহৎ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যে গম আমদানি হচ্ছে তার মধ্যে পুষ্টিমান ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বিবেচনায় দাম তুলনামূলক বেশি। পুষ্টির মাত্রা সাড়ে ১৩ শতাংশ হলে ৩০২ ডলারের দামটি গ্রহণযোগ্য হতে পারত। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে গমের দাম প্রতি টনে ২৭৫-২৮০ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের হলে এ দাম ন্যূনতম ২৭৯-২৮৩ ডলার। গম আমদানি উন্মুক্ত নিলাম প্রক্রিয়ায় হলে প্রতিযোগিতামূলক দামেই হয়তো গম আমদানি করা যেত। কিন্তু এ গম যেহেতু সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আনা হচ্ছে, ফলে তাদের কমিশন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিবহন খরচ বিবেচনায় দাম বেশি হয়ে থাকতে পারে।’

গম আমদানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গম আমদানির ক্ষেত্রে দাম বেশি হওয়ার কারণ মূলত এগ্রোকর্প। সিঙ্গাপুরভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠাননের মালিকানায় যুক্তরাষ্ট্রের কেউ নেই। তাদের সুনাম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের কমিশন ও সেই কমিশনে অংশীদারত্বের কারণে দাম বেশি হয়ে থাকতে পারে।’

চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক লোকাল অফিস সিঙ্গাপুরে এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনালের পক্ষে ঋণপত্র বা এলসি ইস্যু করে। সাইট পেমেন্ট-ভিত্তিক ঋণপত্রটি বাণিজ্য দলিল যাচাইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই অর্থ প্রদানযোগ্য। পণ্য বা গম রফতানিকারকের পক্ষের ব্যাংক হলো সিঙ্গাপুর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। পণ্য সরবরাহের পর রফতানিকারক এগ্রোকর্প তার সিঙ্গাপুরের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে দলিল জমা দেবে। সেখানেই বাংলাদেশের পরিশোধ করা অর্থ জমা হবে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘গম যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলেও এর বিপরীতে যে দাম পরিশোধ করা হবে তা সিঙ্গাপুরভিত্তিক তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠানের কারণেই সিঙ্গাপুরে যাবে। তারপর সেখান থেকে কমিশন রেখে হয়তো অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততায় লেনদেন নতুন কিছু না। সেটা হতেই পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কীভাবে আরোপ করবে আর বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টি কীভাবে হিসাবায়ন করবে তা পরিষ্কার না।’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তকে বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণ হিসাব করবে তখন আমদানির ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ সিঙ্গাপুরে করা হলেও পণ্যের উৎসকেই বিবেচনায় নেয়া হবে। ফলে ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত হিসাবায়নে কোনো প্রভাব পড়ার কথা না।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এ আমদানি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ পণ্যের কান্ট্রি অব অরিজিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে রফতানি হয়েছে। যদিও এলসি-পেমেন্ট সিঙ্গাপুরের ট্রেডারের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদক বা রফতানিকারকের শিপিং ডকুমেন্টে ক্রেতা/কনসাইনি হিসেবে সিঙ্গাপুরের ট্রেডারের নাম উল্লেখ থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য পরিসংখ্যান সেই চালানকে সিঙ্গাপুরে রফতানি হিসেবে গণনা করার কথা। কেননা ইনভয়েস ও রফতানি-সংক্রান্ত নথিতে গন্তব্য হিসেবে সিঙ্গাপুর লেখা থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকসে সেটিকে সিঙ্গাপুরগামী চালান হিসেবে বিবেচনা করবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাম যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা নয়।’

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ হিসাব করার সময় এটি যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে ট্রেড হিসেবে কাউন্ট হওয়া কথা, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে নয়। সেই কারণে এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কোনো শুল্ক হ্রাস সুবিধা পাওয়ার কথা না।’

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নয়, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়ের সচিব ও খাদ্য অধিপ্ততরের মহাপরিচালক বরাবর ৬ অক্টোবর ই-মেইল পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গম রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। সেই ই-মেইলে বলা হয়েছে, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হলেও এতে তৃতীয় দেশের কোম্পানির অংশগ্রহণ গভীরভাবে উদ্বেগজনক। একে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের বাণিজ্য নীতির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ই-মেইলে।

গম আমদানি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে পাঠানো ই-মেইলে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বাণিজ্য উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রফতানিকারকদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এমওইউ হোক বা মনোনয়নের আওতায়ই হোক না, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নয় এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ সেই উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

ই-মেইলে আরো বলা হয়, এ বাণিজ্য প্রক্রিয়ায় খোলা ঋণপত্রের আর্থিক লেনদেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের আওতার বাইরে পড়ে। ফলে এ ধরনের কার্যক্রম দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের উদ্দেশ্য ও চুক্তির লক্ষ্যকে ক্ষুণ্ন করছে। আবার এ ধরনের চুক্তির বিষয়বস্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে তারা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত গম কেনার কথা বলেছে। একই বিবেচনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থ প্রদানের পদ্ধতি নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রকেই বিবেচনা করার কথা। দুই ক্ষেত্রেই তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং অর্থপ্রবাহ সে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যাওয়াকে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের নীতিগত লক্ষ্যের বড় বিচ্যুতি হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

তৃতীয় দেশে কার্যরত কোনো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানির অংশগ্রহণকে ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যের অংশ’ হিসেবে উপস্থাপন করা গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখ করে ই-মেইলে বলা হয়, বিশেষ করে যখন অর্থ প্রদানের প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হয় এবং যেখানে কোনো মার্কিন রফতানিকারক সরাসরি জড়িত থাকে না তখন এ ধরনের লেনদেনকে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বৈধ অবদান হিসেবে গণ্য করা যায় না।

জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের চুক্তি হয়েছে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র থেকেই গম আসবে। ইউএস হুইটের লোকাল এজেন্ট এগ্রোকর্প।’

গম আমদানির বিপরীতে অর্থ সিঙ্গাপুরে পরিশোধ হবে কিনা জানতে চাইলে উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘যেখানে প্রিন্সিপাল নির্দেশ দেবে সেখানেই হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। জাহাজ আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গুণগত মানের সার্টিফিকেট দেবে ইউএস হুইট।’

এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমবে? এমন প্রশ্নের জবাবে আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘কিছু তো কমবেই। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যতটা বাণিজ্য ঘাটতি, তা শুধু গম এনে কতটাইবা কমবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আসছে। এর বিপরীতে অর্থ যুক্তরাষ্ট্র কোথায় নেবে এটা তাদের ব্যাপার। সাক্ষী হিসেবে চুক্তিটির সিগনেটরিজ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস।’

বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটস ও ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাবর ৭ অক্টোবর ই-মেইল পাঠানো হয়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ই-মেইলের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

আরও